অনিন্দিতা মনি রায় ঘোষ

 অনিন্দিতা

মনি রায় ঘোষ
আজ অনিন্দিতা ভীষণ তৃপ্ত।একটা অদ্ভুত শান্তি ওকে ছুঁয়ে দিয়েছে আজ।সারাজীবনেও এমন শান্তি ও পায়নি।তবে অনিরুদ্ধের মত এমন একজন জীবনসঙ্গী না পেলে বোধহয় এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হতনা।তাই সারাজীবন অনিরুদ্ধর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে অনিন্দিতা।
প্রথম সন্তান মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য যে অবহেলা অনিন্দিতা পেয়েছে তা হয়ত সারাজীবন ওর মনের এক কোনে সযত্নে থেকে যাবে।অনিন্দিতার ঠাকুরদা ঠাকুমা এনারা কোনদিন অনিন্দিতাকে ভালোবাসা দিতে পারেনি যেটা ওর প্রাপ্য ছিল।
দাদুর পরপর তিনটে মেয়ে।বংশে ছেলে বলতে ছিলেন শুধু অনিন্দিতার বাবা।অনিন্দিতার বাবা খুব ছোটবেলাতেই সংসারের ঘানি টানতে শুরু করেছিলেন।কারন অনিন্দিতার দাদু ছিলেন খুব কুড়ে প্রকৃতির মানুষ। সংসারে এতজন মানুষ এতগুলো ছেলেমেয়ে অথচ কোনদিন সেভাবে কোন কাজ করেননি।তাই রমেশ বাবুকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল।
তিন বোনের বিয়েও দিয়েছেন একার হাতে।তাই তার প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়াতে বেশ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন তিনি।টানা এক সপ্তাহ মেয়ের মুখ দেখেননি।আর দাদু ঠাকুমাও পরিস্কার জানিয়ে মেয়েকে নিয়ে যেন কোন আদিখ্যেতা না করা হয়।
সেদিন অনিন্দিতার মা অদিতি শুধু নীরবে চোখের জল ফেলেছিল।সদ্যজাত মেয়েটার কি দোষ সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না।মেয়েরা তো আর সংসারের হাল ধরতে পারেনা তাই মেয়ে হয়ে জন্মানো নাকি পাপ।আর মেয়ের জন্ম দেয়াও পাপ।এরকম ধ্যান ধারনাই পোষন করত সেন পরিবার।আসলে রমেশ বাবু সারাজীবন এই সংসারের জন্য খেটেছেন অনেক কষ্ট করে বোনদের বিয়ে দিয়েছেন তাই মেয়ে দেখলেই তার আতঙ্ক হতো।ভেবেছিলেন একটা ছেলে হবে,সংসারের হাল ধরবে কিন্তু তার বিপরীত হওয়াতেই তার যত আপত্তি।কিন্তু ভগবান ও বোধহয় এদের ওপর দয়া দেখাতে কার্পণ্য করেনি।তাই অনিন্দিতার পাঁচ পেরোতেই ঘরে এল গোপাল ঠাকুর।হ্যা অনিন্দিতার ঠাকুমা ছেলেকে এই নামেই ডাকতো।আর রমেশ বাবু সাধ করে নাম রাখলেন মোহন।অনিন্দিতাও ভাইকে পেয়ে যারপরনাই খুশি।সংসারে খুশির আর সীমা রইল না।এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চাইলেন।আস্তে আস্তে রমেশ বাবুর ব্যবসারও উন্নতি হতে লাগল।ছেলের জন্মের পরেই ঘরে যেন লক্ষী এল।তা নিয়েও অনিন্দিতাকে কম মন্দ কথা শুনতে হয়নি।বলা বাহুল্য সংসারে অনিন্দিতার স্থান আরোই ক্ষীন হলো।একমাত্র মা ছাড়া তেমন আদর ও কারো কাছ থেকেই পায়নি।মা ছেলের থেকেও মেয়েকে বেশি করে আগলে রাখত।কারন ছেলেকে আগলানোর জন্য অনেকেই ছিল।
মোহন একটু বড় হতেই পড়াশোনা তার মাথায় উঠল।স্কুল পালানো,খারাপ সঙ্গ,আর নেশায় হাতেখড়ি এই সবকিছুতেই পারদর্শী হয়ে উঠল।আদরে বাদর তৈরি হল একটা।ছেলেকে শাসন করার কোনো অধিকার অদিতির ছিলনা।শুধু চোখের সামনে ছেলের উচ্ছন্নে যাওয়া দেখা ছাড়া আর কোন উপায় তার ছিল না।
ছেলের বায়না দিনকে দিন আকাশ ছোঁয়া হতে লাগল।আজ বাইক কিনে দাও,কাল দামি ফোন কিনে দাও পরশু বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাব এত টাকা লাগবে,এসব রোজকার গল্প হয়ে দাড়ালো।রমেশ বাবু তার সাধ্যের বাইরে গিয়ে ছেলের সব দাবি পূরণ করতে লাগল।সেই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল কিন্তু মোহন তাতেও খুশি হতে পারছিল না।কারণ ততদিনে মোহন নারী সঙ্গে মোহিত হতে শুরু করেছিল।মোহনের বেপরোয়া জীবন যাপন দেখে মেয়েরাও ফায়দা লুটতে শুরু করল।উঠতি বয়সের ছেলে চোখে তার রঙিন চশমা।নারীর স্বাদ পেয়ে দিনের পর দিন তার চাহিদা ভয়ঙ্কর রকম বেড়ে গেল।বিভিন্ন ধরণের নেশা মোহনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।চাহিদা মত টাকা দিতে না পারলেই বাড়িতে তুমুল অশান্তি।ভয়ঙ্কর রুপ ধারন করত মোহন।বাবা মা কে অকথ্য গালাগাল দিতেও পিছপা হত না।
ততদিনে অনিন্দিতা মাস্টার্স কমপ্লিট করে তার উপযুক্ত চাকরি ও পেয়ে গেছে।
সেই অফিসেরই উচ্চপদস্থ কর্মচারী অনিরুদ্ধ বক্সি।অনিন্দিতার মিষ্টি স্বভাবের কারণে ওকে বাইরের সবাই ছোটবেলা থেকেই খুব পছন্দ করত।স্কুলে কলেজে মাস্টার মশাই দের কাছেও খুব প্রিয় ছিল অনিন্দিতা।কলেজে বহু পুরুষ ওকে প্রেম নিবেদন করেছে কিন্তু পড়াশোনা ছাড়া আর কোন দিকেই ভ্রুক্ষেপ ছিলনা ওর।একটা জেদ মনের মধ্যে পুষে রেখেছিল।যে করেই হোক্ একটা ভালো চাকরি জোগাড় করতেই হবে।নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
অনিরুদ্ধ নিজের থেকেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।অনিরুদ্ধের চোখের দিকে তাকিয়ে অনিন্দিতা সারা দিয়েছিল সেই বন্ধুত্বে।
ধীরে ধীরে কখন যে সেই বন্ধুত্ব ভালোবাসার আকার ধারণ করেছিল সেটা আর কেউই বোধহয় টের পায়নি।
অনিন্দিতার শর্ত ছিল একটাই,চাকরি করে টাকা জমিয়ে যেদিন নিজের বিয়ের খরচ নিজেই বহন করতে পারবে সেদিনই বিয়ের পিড়িতে বসবে।অনিরুদ্ধ ও সম্মান করেছিল অনিন্দিতার সিদ্ধান্তকে।।অদিতির বাবা বিয়েতে যা গয়না দিয়েছিল তাই দিয়েই মেয়েকে সাজিয়ে দিয়েছিল অদিতি।অনিন্দিতা নিতে চায়নি মা এর হাতে পায়ে ধরে বারণ করেছিল গয়না দিতে কিন্তু অদিতির চোখের জলের কাছে হার মানতে হয়েছিল।ইচ্ছে না থাকলেও গয়নাগুলো নিতে হয়েছিল।বিয়েতে এক টাকাও রমেশ বাবু কে খরচা করতে দেয়নি অনিন্দিতা।
রমেশ বাবু মেয়েকে ভালোবাসতো কিন্তু সেভাবে প্রকাশ করতে পারেনি কোনদিন।একটু যেন দুরে দুরেই রেখেছে মেয়েকে।
যেদিন জানতে পারল সই নকল করে বাড়ি বন্ধক রেখে দশলাখ টাকা টাকা হাতিয়েছে মোহন সেদিন টনক নড়েছিল বাড়িশুদ্ধ সকলের
রমেশ বাবুর ব্যবসার তখন যা অবস্থা তাতে দশলাখ টাকা জোগাড় করে বাড়ি ছাড়িয়ে আনা সম্ভব ছিলনা।ছেলের সমস্ত চাহিদা পূরন করতে করতে চারদিকে ধারদেনাও কম নয়।
ছমাসের মধ্যে টাকা দিতে না পারলে এত সাধের বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।পথে নামতে হবে গোটা পরিবারকে।এদিকে মোহন টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছে।মাথা চাপড়ানো ছাড়া আর যখন কোন উপায় নেই তখন ভরসার হাত বাড়িয়ে দিল অবহেলিত সেই মেয়ে।মা এর দেয়া গয়না গুলো বন্ধক রেখে আর নিজের জমানো সমস্ত টাকা একত্র করে বাবার হাতে তুলে দিল।অনিরুদ্ধও সমান ভাবে পাশে এসে দাঁড়ালো।সই নকল করেছে এটা প্রমান করতে হয়ত পারত আইনি সাহায্য নিয়ে,কিন্তু মোহনের নামটাই উঠে আসত সবার আগে।পরিবারের গায়ে অসম্মানের দাগ লাগাতে চায়নি অনিন্দিতা। তাই টাকা শোধ করে বাড়ির দলিল ফিরিয়ে দিল বাবাকে।মাকে আশ্বাস দিল যে,তার বাবার দেয়া গয়না ছাড়িয়ে আনবে খুব শীঘ্রই।অনিরুদ্ধ পাশে না থাকলে এতটা মনের জোর পেত কিনা অনিন্দিতা জানেনা।কিন্তু বাবার জন্য এটুকু করে ও যে মানসিক শান্তি পেল আজ সেটার অনুভূতি ও হয়ত কাউকেই বোঝাতে পারবেনা।মেয়েরা নাকি সংসারের হাল ধরতে পারেনা এমনটাই শুনে শুনে বড় হয়েছে ও।আজ সেটা মিথ্যে প্রমাণ করল দায়িত্ব নিয়ে।আজ ওর জালা জুড়োলো।
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল রমেশ বাবু।লজ্জায় মাতা নত হয়ে এল ঠাকুমা দাদুরও।অনিন্দিতা শুধু কয়েকটা কথা বলল,
তোমরা একজন নারীমূর্তিকে লক্ষী রুপে পুজো করো,অথচ রক্ত মাংসের কন্যা সন্তানকে অবহেলা করো।
নারী পুরুষ একে অপরের পরিপূরক।কেউ ছোট বা কেউ বড় নয়।খারাপ ভালো তো উভয়ের মধ্যেই আছে।আজ পুরুষ হিসেবে অনিরুদ্ধ পরের ছেলে হয়েও তোমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।তাই মোহন খারাপ বলেই সব ছেলে খারাপ নয়।সবটাই নির্ভর করে ব্যাক্তিবিশেষের ওপর।সম্মান কখনো জোর করে পাওয়া যায় না।সম্মান নিজের যোগ্যতায় অর্জন করে নিতে হয়।
তাই মানুষের কর্ম না দেখে শুধু লিঙ্গ দেখে বিচার করা উচিত নয়।
রমেশ বাবু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।কিছু বলার ভাষা নেই তার।চোখে মুখে অনুতাপের অনুভূতি স্পষ্ট।





Comments