ধারাপাতের হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ সরকার
ধারাপাতের হিসাবে
_________________
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
(এক)
আজ সকালে ঘুম ভেঙে অভীক দেখল যে সুতৃপ্তি আগেই উঠে গেছে। রান্নাঘরে টুংটাং শব্দে বুঝল যে একটু পরেই চা আসছে। সুতৃপ্তিকে বিয়ের আগে থেকেই ও জানতো যে ওর বউ আর্লি রাইজার নয়। তাহলে এই রোববার সাততাড়াতাড়ি উঠে চা বানাতে কেন উঠল?
অভীক মুখহাত ধুয়ে রান্নাঘরে গেল। গ্যাসে তখন চা ফুটতে ফুটতে কালো হয়ে গেছে আর সুতৃপ্তি স্থাণুর মত সেটাই একমনে দেখছে।
ও যেন একটা পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে।
অভীক ওকে ডাকলনা। বরং গ্যাস বন্ধ করে দিয়ে নিঃশব্দে গিয়ে বউকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
সুতৃপ্তি তখন যেন কোন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। অভীকের আলিঙ্গনেও সেটা কাটলো না।
এই অসুখটা তো আর নতুন নয়। এটা আসলে নিউরোট্রান্সমিটার ইমব্যালেন্স। এই রোগটাই যে এমন। অভীককে মাঝেমাঝে ও চিনতেও পারেনা তবুও অভীক ওর যত্ন নেয় আগের মতোই। সুতৃপ্তিকে ছাড়া যে ওর কাউকেই ভালো লাগেনা আর।
অভীক আর সুতৃপ্তির অনেকদিনের রিলেশান। কলেজজীবনের থেকেই। তবে ওরা অবশ্য দ্বিতীয়বার এক সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছে এই সবে ক'মাস হলো। আড়াই বছরেের বিবাহিত জীবনের শেষে অনিবার্য সেই ডিভোর্সের পর অভীক বিনাবাক্যব্যয়ে সুতৃপ্তির কাছেই ফিরে আসে।
দুজনের জীবনে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ আসলে শেষ হয়নি বলে ওরা যেন জানত মিলতে ওদের সেই হবেই।
আসলে সুতৃপ্তি তখন মিসক্যারেজের পর পাগল পাগল অবস্হা।এর ওপর ওর হাসবেন্ড তখন আবার ডিভোর্সের মামলাও করেছে।
অভীক নিজেও দু দন্ড ওকে শান্তি দিতেই সঙ্গে নিজেও বিবাহবিচ্ছেদের পর একাই যখন জীবনকে আবার গুছিয়ে নিতেই নাজেহাল ঠিক তখনই স্থির করে সুতৃপ্তিকে নিয়েই পথ চলবে আবার নতুন উদ্যমে।
আসলে সময়ে সব কিছু হলে ওরা নিজেদেরকে হয়ত আর একটু স্থিতি দিতে পারতো।
(দুই)
ভোরবেলাটায় অবশ্য দেখতে বেশ ভালোই লাগে চারপাশটাকে। সুতৃপ্তি এখন কথা টথা বন্ধ করে ঠকঠক করে কাঁপছে। এই পর্বটা এখন অনেকক্ষণ চলবে মনে হচ্ছে। মেন্টাল স্ট্রেসের এই সময়টা ও চায় আরো বেশী করে সুতৃপ্তিকে জাপটে রাখতে। মেয়েটার জীবনে একজন আসল বন্ধুর অভাবটাই নিজে বোঝে ও। তাই তো স্বামীর চেয়ে বন্ধুভাবেই বেশী থাকে অভীক। বিগতজীবনকে নিয়ে বেচারার ট্রমাটা এখনো কাটেনি। এই জীবনে তো আবার নতুন করে পাওয়াটাই তো আসল হলেও বিগত জীবন অকারণ তাড়া করে ফেরে। আবার সবকিছু বোধহয় একেবারে হারিয়ে যায় না।
অভীক আর ওর স্ত্রী অপর্ণার জীবনটা সেই ভালোবাসা আর অধিকারের লড়াইয়ের জেরেই ভেঙে গেল। অভীকের চাকরি, ,অফিসে কাজের জন্য লেট নাইট আর ঘরের মধ্যে চিরন্তন বিবাদ ওকে আবার সুতৃপ্তির কাছে একদিন দাঁড় করিয়ে দিল যেখান থেকেই জীবনটাকে ও একদিন দেখতে শিখেছিল।
ডাক্তার সেন কিন্তু বেশ গম্ভীর। আসলে এই রোগেতে Serotonin, Dopamine এইরকম নিউরো হরমোন যা স্ট্রেস ম্যানেজ করে ও দেহকে সুস্থ রাখে যখন অতিরিক্ত ক্ষরণের কারণে আর তৈরী হতে পারে না তখন ওই সাংঘাতিক ডিপ্রেসন এবং অন্তরের ক্ষয় হয়।
তাই জন্য এখন সুতৃপ্তির মনের এই অসুখ বাড়ছে শুধু নয় মস্তিষ্কের ভালো কোষগুলোতেও রোগের বীজ ধীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অভীক নিজে যথেষ্ট আশাবাদী যে শিগগিরই সুতৃপ্তি সেরে উঠবেই। এমনিতে ওকে দেখলে এসব কিছুই প্রকাশ পাবেনা কিন্তু গাঢ়তর বিচ্ছেদবোধ তাড়িয়ে বেড়ায় অনন্তকাল জুড়ে। অভীক কিন্তু সুতৃপ্তিকে নিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসপাতালে যেতে আজ রাজী। কিন্তু কেউ কি ওকে সারিয়ে দেবে? সেটার উত্তরটাই অজানা এখনো।
নার্স বলল এখুনি একবার তাড়াতাড়ি আসতে। আসলে চ্যানেল ব্লাড নিলেও একঘন্টায় ওটা কিছুই ফ্লো করেনি। ওরা এখন অক্সিজেন কানেকশন রেডি করার আগে ওর অনুমতি চাইছে। অভীকের মাথা তখন আর কাজ করছে না। অভীক তাড়াতাড়ি ফর্মে সই করে দেয় তখুনি।
(তিন)
একটা গোলাপী রংএর আলো এসে ঘুরপাক খাচ্ছে এখন। সবুজ গালচের মত ঘাস যেন পা ফেলতে ডাকছে। সুতৃপ্তি যেন ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেছে। সে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে এসে অভীকের পকেট ধরে ডাকছে।
কি সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে এখন। কোন কষ্টই আর নেই। যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের মতন খানিকটা। সুতৃপ্তির নিজের খুব ভাল লাগছে এখন।
সব যন্ত্রণা কি করে যেন চলেই গেছে শরীর থেকে। খুব অভীককে দেখতে ইচ্ছে করছে আগের মত। কিন্তু সব যে....
ফুলের মত মেয়েটা এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে কি নির্লিপ্ত এক ভঙ্গীতে। ওর বোজা ওই দু চোখে সেই ফেলে আসা না দেখা স্বপ্নের ঘোর জড়িয়ে আছে।
অভীক তার জীবনের চিরাচরিত ওই হিসেবের পর তৃতীয়বার মনেমনেই সুতৃপ্তির সেই অটুট সঙ্গটাকেই পাওয়ার অপেক্ষাতেই থাকবে অন্তহীন এক অপেক্ষায়।

Comments
Post a Comment